শেয়ার বাজার

দূষণের কারণে কীভাবে কমে যাচ্ছে পুরুষদের শুক্রাণুর মান

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: শনিবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৩

দূষণের কারণে কীভাবে কমে যাচ্ছে পুরুষদের শুক্রাণুর মান

সারা বিশ্বেই পুরুষদের বীর্যে শুক্রাণুর মান কমে যাচ্ছে। কিন্তু দম্পতিদের সন্তান না হবার পেছনে এটি এমন একটি কারণ - যা নিয়ে আলোচনা হয় খুবই কম। তবে পুরুষদের এ সমস্যা ঠিক কেন হয় – তা এখন বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করতে শুরু করেছেন।

“আপনার সমস্যাটা সমাধান করা যাবে। চিন্তা করবেন না, আপনাকে আমরা সাহায্য করতে পারবো” – জেনিফার হ্যানিংটনকে বললেন ডাক্তার। “কিন্তু আপনি” – জেনিফারের স্বামী কিয়ারানের দিকে ফিরে বললেন তিনি –“আপনার জন্য আমরা খুব বেশি কিছু করতে পারবো না।“

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বাসিন্দা এই দম্পতি দু বছরের বেশি সময় ধরে সন্তান নেবার চেষ্টা করছেন।

তারা জানতেন, এটা কঠিন হবে কারণ জেনিফারের ‘পলিসিস্টিক ওভেরিয়ান সিনড্রোম’ নামে একটি সমস্যা আছে যা তার উর্বরতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু তারা যার জন্য তৈরি ছিলেন না তা হলো – কিয়ারানেরও একটি সমস্যা আছে।

পরীক্ষায় দেখা গেল, কিয়ারানের বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কম, এবং যা আছে সেগুলোরও নড়াচড়া করার ক্ষমতা কম।

আরো খারাপ খবর হলো, এর চিকিৎসা করা জেনিফারের সমস্যাটার চাইতেও কঠিন , হয়তো অসম্ভব।

হ্যানিংটনের এখনো মনে আছে একথা শোনার পর তার স্বামীর প্রতিক্রিয়ার কথা।

“সে স্তম্ভিত, শোকাহত হয়ে পড়লো। আমি কিছুতেই ব্যাপারটা মানতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল, ডাক্তারই ভুল করেছে।“

মানসিক বিপর্যয়

কিয়ারান সবসময়ই চাইতেন সন্তানের পিতা হতে। “আমার মনে হলো আমিই আমার স্ত্রীকে ডুবিয়েছি“ – বললেন তিনি।

পরের কয়েক বছরে কিয়ারানের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হতে লাগলো। তিনি একা একা অনেক বেশি সময় কাটাতে শুরু করলেন।

তিনি বিছানায় শুয়ে থাকতেন। শান্তি খুঁজতে শুরু করলেন এ্যালকোহলের মধ্যে।

তার পর একসময় শুরু হলো ‘প্যানিক অ্যাটাক’ হওয়া – যার লক্ষণ হঠাৎ শরীর কাঁপতে থাকা, বুক ধড়ফড় করা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া, মাথা ঘোরানো ।

“সেটা ছিল এক গভীর সংকটকাল, মনে হলো আমি যেন একটা অন্ধকার গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি” বলছিলেন কিয়ারান।

পুরুষের অনুর্বরতা নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না

দম্পতিদের সন্তান না হওয়ার যত ঘটনা ঘটে – তার প্রায় অর্ধেকই ঘটে পুরুষের অনুর্বরতার কারণে।

কিন্তু নারীদের অনুর্বরতা নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার তুলনায় পুরুষদের অনুর্বরতা নিয়ে আলোচনা হয় খুবই কম।

এর একটা কারণ হলো এ সমস্যাটিকে ঘিরে নানারকম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রশ্ন আছে – যেন এটা নিয়ে কথা বলাই বারণ।

যেসব পুরুষদের উর্বরতার সমস্যা আছে তাদের অধিকাংশের ক্ষেত্রেই এর কারণ কি তার কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না।

তার ওপর যেহেতু পুরুষদের অনুর্বরতা নিয়ে সমাজে নেতিবাচক ধারণা আছে, তাই অনেককে এ জন্য এক নিরব মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে হয়।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে এ সমস্যা সম্ভবত বাড়ছে।

এতে দেখা যায়, দূষণসহ বিভিন্ন কারণ পুরুষের উর্বরতার ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় বীর্যে শুক্রাণুর মানের ওপর ।

স্বভাবতই ব্যক্তি স্তরে এবং পুরো সমাজের জন্যই এর পরিণাম অত্যন্ত ব্যাপক।

এক গোপন 'উর্বরতা সংকট?'

গত এক শতাব্দীতে সারা বিশ্বে জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।

মাত্র ৭০ বছর আগেও পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ২৫০ কোটি। কিন্তু ২০২২ সালে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৮০০ কোটি।

তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এখন কমে আসছে – যার পেছনে প্রধান কারণগুলো সামাজিক ও অর্থনৈতিক।

সারা বিশ্ব জুড়ে শিশু জন্মের হার রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। পৃথিবীর ৫০ শতাংশ মানুষই এখন এমন দেশগুলোতে বাস করে যেখানে উর্বরতার হার নারীপ্রতি দুটি শিশুরও নিচে। এর ফলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই এক সময় কমে আসবে – যদি অভিবাসন না হয়।

জন্মহার কমার কিছু কারণ আছে যা ইতিবাচক। যেমন নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন অনেক বেড়েছে।

অন্যদিকে, নিম্ন উর্বরতার হারের কিছু দেশ আছে যেগুলোতে অনেক দম্পতিই তাদের যতগুলো সন্তান আছে তার চেয়ে বেশি নিতে চান- কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে পারেন না।

এরই পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে আরো কতগুলো কারণ। একজন ব্যক্তির সন্তান জন্মদানের শারীরিক সক্ষমতাকে বলা হয় ফিকান্ডিটি – যাকে বলা যায়, উর্বরতাকে একটা ভিন্ন মাপকাঠিতে দেখা। এখন, মনে করা হচ্ছে যে এই ফিকান্ডিটির হার বর্তমানে হয়তো কমে যাচ্ছে।

কিছু গবেষণায় আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে বিশেষ করে পুরুষদের মধ্যে প্রজনন-সংক্রান্ত সমস্যার পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে আছে বীর্যে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়া, দেহে টেস্টোস্টেরন নামে হর্মোনের মাত্রা কমে যাওয়া, পুরুষাঙ্গের উত্থানজনিত সমস্যা বেড়ে যাওয়া, এবং অন্ডকোষের ক্যান্সার।

সাঁতার-কাটা দেহকোষ

“শুক্রাণু একটি চমকপ্রদ দেহকোষ” – বলছিলেন ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ সারাহ মার্টিন ডা সিলভা – “তারা অতি ক্ষুদ্র, কিন্তু তারা সাঁতরাতে পারে, তারা শরীরের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে। আর কোন দেহকোষেরই এ ক্ষমতা নেই, তারা অনন্য সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।“

এখন মনে করা হচ্ছে - খুব সামান্য কিছু পরিবর্তনও এই অনন্য বৈশিষ্ট্যধারী কোষগুলোর ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে, বিশেষ করে জোরালো প্রভাব পড়তে পারে তাদের ডিম্বাণুকে নিষিক্ত করার ক্ষমতার ওপর। “

উর্বরতার জন্য যে জিনিসটি বিশেষ জরুরি তা হলো শুক্রাণুর সচলতা, তাদের আকার ও আকৃতি, এবং একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বীর্যের মধ্যে তাদের সংখ্যা কত – যাকে বলে ‘স্পার্ম কাউন্ট।‘

পুরুষদের উর্বরতা পরীক্ষার সময় এগুলো যাচাই করে দেখা সম্ভব।

“সাধারণত প্রতি মিলিলিটার বীর্যের মধ্যে শুক্রাণুর সংখ্যা যদি চার কোটির কম থাকে – তখনই উর্বরতার সমস্যা দেখা যেতে থাকে” – বলছিলেন হাজাই লেভিন, যিনি জেরুসালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

তিনি ব্যাখ্যা করছেন যে স্পার্ম কাউন্টের সাথে উর্বরতার সম্ভাবনার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে।

স্পার্ম কাউন্ট বেশি হলেই যে গর্ভধারণ হবার সম্ভাবনা বেশি হবে তা বলা যায় না – কিন্তু শুক্রাণুর সংখ্যা মিলিলিটারপ্রতি ৪০ মিলিয়নের নিচে নেমে গেলেই গর্ভধারণের সম্ভাবনা অনেক খানি কমে যায়।

অধ্যাপক লেভিন এবং তার সহযোগীরা ২০২২ সালে পৃথিবীব্যাপি স্পার্ম কাউন্টের নিম্নমুখী প্রবণতা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন।

এতে দেখা যাচ্ছে, ১৯৭৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে স্পার্ম কাউন্ট গড়ে ১.২% কমে গিয়ে মিলিলিটারপ্রতি ১০৪ থেকে ৪৯-এ নেমে এসেছে।

এর মধ্যে ২০০০ সাল থেকে শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যাওয়ার হার বেড়ে বছর প্রতি ২.৬%এ উঠেছে।

লেভিন যুক্তি দিচ্ছেন যে এই অধোগতির সাথে হয়তো ‘এপিজেনেটিক্স’ বা মানব জিন যেভাবে কাজ করে তার সম্পর্ক থাকতে পারে – যা সম্ভবত পরিবেশগত বা জীবনযাপন-সংক্রান্ত বিভিন্ন কারণে ঘটছে।

অন্য আরেকটি গবেষণাতেও আভাস পাওয়া গেছে যে শুক্রাণুতে পরিবর্তন বা পুরুষের অনুর্বরতার পেছনে এপিজেনেটিক্সের ভূমিকা থাকতে পারে।

“এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে হয়তো এ সমস্যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে পরিবাহিত হচ্ছে” – বলেন লেভিন।

সবাই এ তত্ত্বের সাথে একমত নন

এই এপিজেনেটিক পরিবর্তনের তত্ত্ব অবশ্য বিতর্কও সৃষ্টি করেছে এবং সবাই এর সাথে একমত নন।

তবে এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে যাতে মনে হয়, এটা হলেও হতে পারে।

“এ ব্যাপারটা (শুক্রাণুর সংখ্যা কমতে থাকা) হচ্ছে পুরুষদের নিম্নগামী স্বাস্থ্যের একটা চিহ্ন – হয়তো গোটা মানবজাতির ক্ষেত্রেই তা ঘটছে” – বলছেন লেভিন – “হয়তো আমরা একটা জনস্বাস্থ্য সংকটের সম্মুখীন, যা ঠেকানো সম্ভব কিনা তা আমরা এখনো জানি না।“

গবেষণা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে মানুষের জীবনযাপনের কিছু উপাদান হয়তো অনুর্বরতা এবং অন্য আরো কিছু স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

এমনও হতে পারে যে শুক্রাণুর মানের এ অবনতি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে জীবনযাপনে পরিবর্তন এনেও ঠেকানো সম্ভব নয়।

গবেষণা থেকে ক্রমশই এমন আরো বেশি প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে এক্ষেত্রে একটি ব্যাপকতর পরিবেশগত হুমকি রয়েছে, আর তা হলো – দূষণ সৃষ্টিকারী নানা ক্ষতিকর পদার্থ।

দূষণ ঘটাচ্ছে প্লাস্টিক এবং অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ

মানুষের ঘরের ভেতরে ব্যবহৃত হয় এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে – তা নিয়ে গবেষণা করছেন যুক্তরাজ্যের নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেবেকা ব্ল্যানচার্ড ।

এই প্রভাব বোঝার জন্য তিনি কাজে লাগাচ্ছেন গৃহপালিত কুকুরকে। কারণ, গৃহপালিত প্রাণী হিসেবে সেই কুকুর একই বাড়িতে থাকছে এবং একই দূষণকারী রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসছে।

রেবেকা গবেষণা করছেন প্লাস্টিক, আগুনরোধী রাসায়নিক, এবং ঘরের অন্যান্য নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী নিয়ে।

এসব রাসায়নিক পদার্থের কিছু কিছু নিষিদ্ধ, কিন্তু পরিবেশে এবং পুরোনো জিনিসপত্রের মধ্যে তার অবশেষ রয়ে গেছে।

তার গবেষণায় দেখা গেছে, এসব রাসায়নিক পদার্থ আমাদের হর্মোন সিস্টেমকে বিঘ্নিত করতে পারে এবং মানুষ ও কুকুর উভয়ের ক্ষেত্রেই উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে।

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, “আমরা মানুষ এবং কুকুর উভয়েরই শুক্রাণুর নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার তথ্য পেয়েছি । তা ছাড়া তার ডিএনএ ভেঙে যাওয়ার পরিমাণও বেড়ে যেতে দেখেছি।“

ডিএনএ ভেঙে যাওয়া বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন, যেসব জিনগত সামগ্রী দিয়ে শুক্রাণু তৈরি - তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা ভেঙে যাওয়া।

এর ফলে গর্ভধারণের পরও নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, ডিএনএ ভেঙে যাওয়ার পরিমাণ যদি বেড়ে যায় তাহলে গর্ভধারণের প্রথম কয়েক মাসের মধ্যে ‘মিসক্যারেজ’ বা ভ্রুণ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনাও বেড়ে যায়।

তার এই তথ্যের সাথে অন্যান্য গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যের মিল আছে। ওই গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে যে প্লাস্টিক, সাধারণ নানা ওষুধ, খাদ্য এবং বাতাসে উপস্থিত রাসায়নিক পদার্থ উর্বরতার ক্ষতি ঘটাতে পারে।

এগুলো শুধু পুরুষ নয়, নারী ও শিশুদের দেহেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

কার্বন এবং কখনোই নষ্ট হয় না এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থের অস্তিত্ব এমনকি গর্ভস্থ শিশুর দেহেও পাওয়া গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনও পুরুষের উর্বরতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বেশ কিছু প্রাণীর ওপর চালানো জরিপে আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি বিশেষ করে শুক্রাণুর ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

দেখা গিয়েছে যে তাপপ্রবাহ কীটপতঙ্গ ও মানুষের শুক্রাণুর ক্ষতি করে।

২০২২ সালের একটি জরিপে দেখা গেছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গরম পরিবেশে বা উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করলে শুক্রাণুর মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

নিম্নমানের খাদ্য, মানসিক চাপ ও এ্যালকোহল

পরিবেশগত নানা কারণের পাশপাশি ব্যক্তিগত নানা সমস্যাও পুরুষদের উর্বরতা কমিয়ে দিতে পারে। যেমন - নিম্নমানের খাদ্য, দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকতে হয় এমন জীবনযাপন, মানসিক চাপ, এ্যালকোহল পান এবং মাদক ব্যবহার ।

বর্তমানে অনেক দম্পতিই অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সে সন্তানের পিতামাতা হচ্ছেন।

তবে নারীদেরকে তাদের “জীবনের সবচেয়ে উর্বর সময়কাল“ বা “বায়োলজিকাল ক্লকের” কথা যতটা মনে করিযে দেয়া হয়, তার বিপরীতে ‘পুরুষদের উর্বরতার ক্ষেত্রে বয়স কোন ব্যাপার নয়’ - এমনটাই আগে মনে করা হতো।

কিন্তু সেই ধারণার এখন পরিবর্তন হচ্ছে।

বেশি বয়সে পিতামাতা হবার ক্ষেত্রে শুক্রাণুর সংখ্যা এবং উর্বরতা কমে যাবার সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে।

এখন বলা হচ্ছে যে পুরুষদের অনুর্বরতাকে আরো ভালোভাবে বুঝতে হবে এবং এ সমস্যা নিরুপণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টিভঙ্গী দরকার।

একই সাথে দূষণ রোধের জরুরি প্রয়োজনের ব্যাপারে সচেতন হতেও বলা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, শুক্রাণুর মান বৃদ্ধির জন্য পুরুষরা ব্যক্তিগতভাবে কী কী করতে পারেন?

রেবেকা ব্ল্যানচার্ড বলছেন, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার এবং ব্যায়াম দিয়ে শুরু করাটা ভালো, কারণ এর সাথে শুক্রাণুর মান উন্নত হবার সম্পর্ক দেখা গেছে।

তিনি আরো বলছেন অরগ্যানিক খাবার খাওয়া এবং বাইফেনল-এ বা বিপিএ-বিহীন প্লাস্টিক ব্যবহার করার কথা। এই বিপিএর সাথে নারী ও পুরুষ উভয়েরই অনুর্বরতার সম্পর্ক আছে।

“এরকম ছোট ছোট কিছু পন্থা আপনি নিতে পারেন” – বলছেন রেবেকা ব্ল্যানচার্ড।

হ্যানিংটন দম্পতি শেষ পর্যন্ত আইভিএফ পদ্ধতিতে দুটি সন্তানের বাবা-মা হয়েছেন।

“আমি প্রতিদিনই আমার সন্তান দুটির জন্য কৃতজ্ঞতা বোধ করি” বলছেন কিয়ারান হ্যানিংটন - “কিন্তু অতীত দিনগুলোর কথা আমি ভুলিনি, কখনোই তা সম্ভব নয়।“

মশা: ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ যে ৫ টি মশাবাহিত রোগ বাংলাদেশে ছড়ায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

মশা: ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ যে ৫ টি মশাবাহিত রোগ বাংলাদেশে ছড়ায়

পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে, এর মধ্যে মাত্র ১০০ টির মত প্রজাতি রোগ ছড়ায়। এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে মশা থেকে ২০টির মত রোগ ছড়ায়। পুরো পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের আক্রমণে প্রতিবছর যত মানুষ মারা যান, তাদের মধ্যে মশাবাহিত রোগে মারা যান সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ। মশাবাহিত রোগ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ২০শে অগাস্ট পালিত হয় বিশ্ব মশা দিবস।

বাংলাদেশের মশা

কীটতত্ত্ববিদ এবং গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশার খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ১৪টি প্রজাতির মশা পাওয়া যায়।কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মশাবাহিত পাঁচটি রোগের কথা জানা যায়।

এর মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জাপানিজ এনসেফালাইটিস।

ম্যালেরিয়া

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়। বাংলাদেশে মোট ৩৬ প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা যায়, এদের মধ্যে সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, এই সাত প্রজাতির মধ্যে চারটি প্রজাতি ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক বাংলাদেশে।

এই মূহুর্তে বাংলাদেশের ১৩টি জেলার ৭২টি থানায় ম্যালেরিয়া রোগের উপস্থিতি রয়েছে। মূলত পার্বত্য ও সীমান্ত এলাকাতেই ম্যালেরিয়া বেশি দেখা যায়। এটি গ্রীষ্মকালে হয়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, মারা যান ১৫৪ জন। পরে এ সংখ্যা কমে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খান‌ বিবিসিকে বলেছেন, এখন ম্যালেরিয়া প্রকোপের ৯০ শতাংশের বেশি হয় দেশে তিন পার্বত্য জেলায়। তিনি জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে।

ফাইলেরিয়া

কিউলেক্স মশার দুটি প্রজাতি এবং ম্যানসোনিয়া মশার একটি প্রজাতির মাধ্যমে বাংলাদেশে ফাইলেরিয়া রোগ ছডায়।

ফাইলেরিয়া রোগে মানুষের হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। একে স্থানীয়ভাবে গোদ রোগও বলা হয়।

বাংলাদেশের ৩৪টি জেলায় ফাইলেরিয়া আক্রান্ত রোগী দেখা যায়।

ডেঙ্গু

এডিস মশার দুইটি প্রজাতি- এডিস ইজিপ্টি এবং অ্যালবোপিকটাস, মূলত ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু ছড়ায়।

এডিস মশা পাত্রে জমা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। সাধারণত বর্ষাকালে এর ঘনত্ব বেশি হয়, ফলে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবও এ সময়ে বেড়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে চলতি বছর করোনাভাইরাস মহামারির পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ অনেকগুন বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে ১৭ই অগাস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৬,৬৫০ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে।

তীব্র পেটে ব্যথাও হতে পারে। শরীরে বিশেষ করে মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা হয়। জ্বরের ৪/৫ দিন পার হলে শরীরজুড়ে র‌্যাশ বা ঘামাচির মত লালচে দানা দেখা দেয়।

সাথে বমি ভাব, এমনকি বমিও হতে পারে।

ডেঙ্গু গুরুতর হলে রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়, চোখের কোনা, দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

ডা. আফসানা আলমগীর খান‌ বলেছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রধাণ কারণ হচ্ছে আক্রান্ত হবার পর পরিস্থিতি খারাপ না হওয়া পর্যন্ত লোকে ডাক্তারের কাছে যায় না।

তিনি বলেন, লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা মাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সথে রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ খেয়াল রাখতে হবে।

চিকুনগুনিয়া

চিকুনগুনিয়া রোগও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে।

চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মত।

তবে মাথাব্যথা, বমি ভাব, দুর্বলতা, সর্দি-কাশি, এবং র‌্যাশের সঙ্গে শরীরে হাড়ের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা হয়।

চিকুনগুনিয়া হলে অধিকাংশ সময় তিন থেকে চার দিনের মধ্যে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু হাড়ের সংযোগস্থলগুলোতে হওয়া ব্যথা কারো কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ভোগায়।

জাপানিজ এনসেফালাইটিস

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, জাপানিজ এনসেফালাইটিস রোগটি কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

১৯৭৭ সালে মধুপুর বন এলাকায় প্রথম জাপানিজ এনসেফালাইটিস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন।

এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং খুলনা অঞ্চলে এই রোগটি পাওয়া যায়।

অধ্যাপক বাশার বলছেন, বাংলাদেশে মশাবাহিত এই পাঁচ ধরণের রোগই মূলত দেখা যায়।

তবে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে জিকা ভাইরাস আক্রান্ত দুইজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন।

এরপর গত কয়েক বছরে আর জিকা ভাইরাস আক্রান্ত কাউকে শনাক্তের কথা শোনা যায়নি।

ফলে বাংলাদেশে এর অস্তিত্ব আছে বলে তিনি মনে করেন না।

কীভাবে মশাবাহিত রোগ থেকে সুস্থ থাকবেন

মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সতর্ক হবার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ আক্রান্ত হবার পর সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হলে মৃত্যুসহ নানা ধরণের জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডা. আফসানা আলমগীর খান এবং অধ্যাপক কবিরুল বাশারের পরামর্শ অনুযায়ী মশাবাহিত রোগ থেকে সুস্থ থাকার কয়েকটি উপায় বলছেন, যা এরকম

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার এই দুইটি রোগের জন্যই দায়ী এডিস মশা সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার আগে এডিস কামড়ায়। ফলে এই দুই সময়ে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখতে হবে

ঘুমানোর সময় মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে হবে

বাড়ির ছাদে বা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনে, বাতিল টায়ার কিংবা প্লাস্টিক কন্টেইনার- কোথাও যাতে তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি পানি জমা না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে

মশার কামড় থেকে বাঁচতে নানা ধরণের রিপেলেন্ট অর্থাৎ মশা তাড়ানোর পণ্য যেমন বিভিন্ন ধরণের কয়েল, স্প্রে, ক্রিম জাতীয় পণ্য ব্যবহার করা, তবে এর মাত্রা ও প্রয়োগ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

এগুলো সবই মশাবাহিত কোন রোগে আক্রান্ত হবার আগের সতর্কতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

মশা তাড়ানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন মশা তাড়াতে কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

তবে ঢাকায় মশার সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে তাতে এসব কায়দা কতটা খাটবে সে আশংকাও রয়েছে।

অনেক বছর ধরে মশা তাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কয়েকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি নিচে বর্ণনা করা হলো:

নিমে মশা তাড়ানোর বিশেষ গুণ রয়েছে। প্রাচীনকালে মশা তাড়াতে নিমের তেল ব্যবহার করা হত। ত্বকে নিম তেল লাগিয়ে নিলে মশা ধারে-কাছেও ভিড়বে না বলে প্রচলিত।

বলা হয়ে থাকে মশা কর্পূরের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কর্পূর দিয়ে রাখলে মশা পালিয়ে যায়।

লেবু আর লবঙ্গ একসঙ্গে রেখে দিলে ঘরে মশা থাকে না বলে প্রচলিত আছে। এগুলো জানালায় রাখলে মশা ঘরে ঢুকতে পারবে না

ব্যবহৃত চা পাতা ফেলে না দিয়ে রোদে শুকিয়ে সেটা জ্বালালে চা পাতার ধোঁয়ায় ঘরের সব মশা-মাছি পালিয়ে যাবে। কিন্তু এতে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হবে না।

মশা নিয়ে কয়েকটি মজার তথ্য

  • একটি মশা সেকেন্ডে প্রায় ৩০০-৬০০ বার ডানা ঝাপটায়, মশা ওড়ার সময় এই ডানা ঝাপটানোর শব্দই শুনি আমরা
  • কেবলমাত্র স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়, পুরুষ মশা নয়।
  • মশা ঘণ্টায় প্রায় দেড় মাইল বেগে উড়তে পারে
  • ডিম ফুটে বের হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই মশা মানুষকে কামড়ে রক্ত শুষে নেয়
  • মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীকে কামড়ানোর পাশাপাশি পাখি ও সরীসৃপের শরীরেও হুল ফোটায়
  • মশা তার নিজের ওজনের তিনগুণ রক্ত শুষে নিতে পারে

মেয়াদ শেষ, চুক্তি ছাড়াই চলছে বিনোদিনী নগর মাতৃসদন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ মে, ২০২৬

মেয়াদ শেষ, চুক্তি ছাড়াই চলছে বিনোদিনী নগর মাতৃসদন

সিসিকের মৌখিক অনুমতিতে ৫ মাস ধরে ‘অবৈধ’ কার্যক্রম, প্রশ্নে জননিরাপত্তা
হাসান জুলহাস :: সিলেট নগরীর প্রাণকেন্দ্র ধোপাদিঘীর পাড়ে অবস্থিত বিনোদিনী নগর মাতৃসদন কেন্দ্রকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও অবৈধ পরিচালনার অভিযোগ| সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন আরবান হেলথ সার্ভিস প্রকল্পের এই প্রতিষ্ঠানটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কোনো বৈধ লিখিত চুক্তি ছাড়াই গত প্রায় পাঁচ মাস ধরে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এনজিও ‘সীমান্তিক’| এতে জননিরাপত্তা, সেবার ˆবধতা এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের প্রশ্ন| সুত্রে জানা যায়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আরবান হেলথ সার্ভিস প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত এ মাতৃসদন কেন্দ্র বাস্তবায়ন করে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)|

২০২০ সালের ১ জুলাই টেন্ডারের মাধ্যমে ৫ বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় এনজিও সীমান্তিক। সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০২৫ সালের ৩০ জুন।
পরবর্তীতে সীমান্তিকের লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে সিসিক সাময়িকভাবে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সেই সময়সীমাও পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো চুক্তি বা বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই এখনও প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে সিসিক নগর ভবনে যোগাযোগ করা হলে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন,“এখানে মিথ্যা বলার কিছু নেই। সীমান্তিকের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২৫ সালের ৩০ জুন। পরে তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে কোনো লিখিত ডকুমেন্ট ছাড়া মৌখিকভাবে চলছে।”
তিনি আরও জানান, আগে মাতৃসদনের তিন দিনের প্যাকেজ ছিল ১২ হাজার টাকা, যা বর্তমানে বাড়িয়ে ১৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্ডের বেড ভাড়া দৈনিক ২০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়ও রোগীকেই বহন করতে হচ্ছে।

খরচ বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আগে সিটি কর্পোরেশন থেকে মাসিক কিছু খরচ দেওয়া হতো। এখন তা দেওয়া হয় না। তাই ডাক্তার-কর্মচারীদের বেতন দিতে খরচ বাড়ানো হয়েছে।” সিসিক থেকে বর্তমানে কোনো আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয় কি না—এমন প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “না, সিসিক থেকে এখন কোনো খরচ দেওয়া হয় না।”

এদিকে সীমান্তিকের পরিচালক পারভেজ আলম মুঠোফোনে জানান, “সিসিকের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমরা চালাচ্ছি। খরচের অর্ধেক সিসিক দেওয়ার কথা।”
তবে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে সিসিকের সঙ্গে সীমান্তিকের কোনো বৈধ লিখিত চুক্তিই নেই, সেখানে প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, চিকিৎসা জটিলতা কিংবা রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে দায় নেবে কে? সীমান্তিক, নাকি সিসিক?

এদিকে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে থাকা আরবান হেলথ প্রকল্প স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী  সিসিক প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে বিনোদিনী নগর মাতৃসদন কেন্দ্র সিলেটের সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তর করেন। কিন্তু হস্তান্তরের পরও রবিবার (১৭ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্তিক এনজিও আগের মতোই কেন্দ্রটির কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: নাছির উদ্দিন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি  বলেন আমরা শুধু ভবন বুঝে পেয়েছি ভবনের লজিস্টিক বুঝে পাইনি, এক সপ্তাহের মধ্যেই আশা করি বুঝে পাবো। অবৈধভাবে ৫ মাস যাবৎ চলছে, এবিষয়ে তিনি বলেন কাগজপত্র দেখে অবৈধ হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

অবৈধভাবে ৫ মাস যাবৎ চলছে, এবিষয়ে তিনি বলেন কাগজপত্র দেখে অবৈধ হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে| এ ঘটনায় সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি নির্দেশনা ও প্রশাসনিক হস্তান্তরের পরও কীভাবে একটি এনজিও লিখিত অনুমোদন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে? আর এই ‘মৌখিক অনুমতি’র আড়ালে চলছে না তো নতুন কোনো অনিয়মের খেল?



হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ মে, ২০২৬

হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি

সারাদেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। এরিমধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু চারশ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি এই তথ্যের বাইরে প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়েও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে হামের এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। সারাদেশে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতের পর আবারও বেড়েছে মশার প্রকোপ। তবে এবার আর কিউলেক্স মশা না, বাড়ছে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিসের বিস্তার।

গত পাঁচ বছরের হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে সারা দেশে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। তাই এবার ডেঙ্গু নিয়ে আগাম সতর্কতার কথা জানিয়েছেন দুই সিটির কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, এডিস মশা প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনই রাজধানীর বাসিন্দা।

রাজধানীসহ দেশের জেলা শহরগুলোতে সব সময় বহু ভবন নির্মাণাধীন থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘসময় লাগে এসবের কাজ শেষ হতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের স্থাপনায় জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর বংশবিস্তার হচ্ছে। জায়গাগুলো নজরে রেখে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করলে এ বছর ডেঙ্গুর মাত্রা গত বছরের তুলনায় বাড়তে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, এখনই যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে সামনে ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়তে পারে। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ার ফলে এডিস মশা বাড়বে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুও বাড়বে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেসব কীটনাশক প্রয়োজন তার পর্যাপ্ত মজুদ রাখতে হবে সিটি কর্তৃপক্ষকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া গত ৫ বছরের ডেঙ্গু রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই ছিল রাজধানীর বাসিন্দা। দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে রাজধানীর দক্ষিণে মৃত্যুর হার বেশি। প্রতিবছরের মে-জুন মাসে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সংখ্যার সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা গেছে।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে রাজধানীতে ৯৫ জন এবং সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। সে বছর সারা দেশে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে রাজধানীতেই মারা যান ১৭৩ জন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী। বছরটিতে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মারা যায় রাজধানীতে। সারা দেশে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৫৭৫ ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। সাম্প্রতিককালের নতুন বিপদ হচ্ছে, আগে মূলত ঢাকাসহ নগরে সীমিত থাকলেও এডিস মশা এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি বছরও সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আক্রান্ত এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) পাঠিয়ে বিশেষ মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ‘শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসা-বাড়ি করি পরিষ্কার’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। লিফলেট, এসএমএস এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে এ বছর আগাম সতর্ক তারা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রেন, খাল ও জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার অভিযান চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাইকিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। কিছু নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, রোববার থেকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে বাউল গানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রোববারই প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর ৭৫ ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর হটস্পট শনাক্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘প্রাক্‌-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। এ সময় ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

এ ছাড়া ডিএসসিসি বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও সচেতনতা কার্যক্রম, খাল, ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা কমাতে পোর্টেবল পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ এবং প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের ঘোষণা দিয়ে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হাম বা অন্য কোনো রোগের কারণে ডেঙ্গুকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

হালিমুর রশিদ বলেন, ‘আজও (গতকাল) ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যাতে রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা ও সমন্বয় কার্যক্রম দ্রুত করা যায়। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক, বিশেষ করে স্যালাইন, ওষুধ ও পরীক্ষার সামগ্রী জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।’

এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের জন্য বর্তমান নগর কাঠামোকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেন নগর বিশেষজ্ঞ, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাজধানীতে জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। এত জনঘনত্বপূর্ণ স্থানে মশাবাহিত রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়। ঢাকায় বৃষ্টিপাতের সময়ে নানা কারণে জলাবদ্ধতা হয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (শহরের যেসব স্থানে উষ্ণতা বেশি) এর প্রভাব থাকে, যার ফলে মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।’

এ বছর ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়বে এমন আশঙ্কা জানিয়ে এই নগর গবেষক বলেন, ‘পরিসংখ্যান আমাদের সে তথ্যই দিচ্ছে। নগর কাঠামোর কোনো পরিবর্তন না হওয়া এবং বর্তমান নগর পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।’