শেয়ার বাজার

হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১২ মে ২০২৬

হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি

সারাদেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। এরিমধ্যে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশুমৃত্যু চারশ ছাড়িয়ে গেছে। সরকারি এই তথ্যের বাইরে প্রকৃত সংখ্যা এরচেয়েও বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে হামের এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু। সারাদেশে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিপাতের পর আবারও বেড়েছে মশার প্রকোপ। তবে এবার আর কিউলেক্স মশা না, বাড়ছে ডেঙ্গুর জন্য দায়ী এডিসের বিস্তার।

গত পাঁচ বছরের হিসাব অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে সারা দেশে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা। তাই এবার ডেঙ্গু নিয়ে আগাম সতর্কতার কথা জানিয়েছেন দুই সিটির কর্মকর্তারা। তারা বলেছেন, এডিস মশা প্রতিরোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সারা দেশে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুজনই রাজধানীর বাসিন্দা।

রাজধানীসহ দেশের জেলা শহরগুলোতে সব সময় বহু ভবন নির্মাণাধীন থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘসময় লাগে এসবের কাজ শেষ হতে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এ ধরনের স্থাপনায় জমে থাকা পানিতে ডেঙ্গুর বংশবিস্তার হচ্ছে। জায়গাগুলো নজরে রেখে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না করলে এ বছর ডেঙ্গুর মাত্রা গত বছরের তুলনায় বাড়তে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশাবাহিত রোগবিষয়ক গবেষক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার জানান, এখনই যথাযথ প্রস্তুতি না নিলে সামনে ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়তে পারে। তিনি বলেন, টানা বৃষ্টি ও আর্দ্র আবহাওয়ার ফলে এডিস মশা বাড়বে। একই সঙ্গে ডেঙ্গুও বাড়বে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। যেসব কীটনাশক প্রয়োজন তার পর্যাপ্ত মজুদ রাখতে হবে সিটি কর্তৃপক্ষকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া গত ৫ বছরের ডেঙ্গু রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর অর্ধেকই ছিল রাজধানীর বাসিন্দা। দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে রাজধানীর দক্ষিণে মৃত্যুর হার বেশি। প্রতিবছরের মে-জুন মাসে এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সংখ্যার সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা গেছে।

অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু গত কয়েক বছরে উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২১ সালে রাজধানীতে ৯৫ জন এবং সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০২২ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার নেয়। সে বছর সারা দেশে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে রাজধানীতেই মারা যান ১৭৩ জন। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ছিল দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী। বছরটিতে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মারা যায় রাজধানীতে। সারা দেশে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালে যথাক্রমে ৫৭৫ ও ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। সাম্প্রতিককালের নতুন বিপদ হচ্ছে, আগে মূলত ঢাকাসহ নগরে সীমিত থাকলেও এডিস মশা এখন গ্রামাঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় চলতি বছরও সরকার ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নানা ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে আক্রান্ত এলাকায় কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) পাঠিয়ে বিশেষ মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জনসচেতনতা বাড়াতে ‘শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসা-বাড়ি করি পরিষ্কার’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। লিফলেট, এসএমএস এবং গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপনসহ সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে এ বছর আগাম সতর্ক তারা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি ড্রেন, খাল ও জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার অভিযান চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডগুলোতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাইকিংয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সতর্ক করা হচ্ছে। কিছু নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, রোববার থেকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোধে বাউল গানের মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁরা।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) রোববারই প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাজধানীর ৭৫ ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর হটস্পট শনাক্তে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘প্রাক্‌-বর্ষা এডিস লার্ভা জরিপ শুরু করেছে। এ সময় ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তথ্যভিত্তিক ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দায়িত্বে অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

এ ছাড়া ডিএসসিসি বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে জরিমানা ও সচেতনতা কার্যক্রম, খাল, ড্রেন ও বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং জলাবদ্ধতা কমাতে পোর্টেবল পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ এবং প্রতি মাসের প্রথম শনিবার ‘ক্লিনিং ডে’ পালনের ঘোষণা দিয়ে নাগরিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেছেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সার্বিক প্রস্তুতি রয়েছে। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘হাম বা অন্য কোনো রোগের কারণে ডেঙ্গুকে কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। আমরা সমান গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

হালিমুর রশিদ বলেন, ‘আজও (গতকাল) ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক হয়েছে। সেখানে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করতে বলা হয়েছে, যাতে রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা ও সমন্বয় কার্যক্রম দ্রুত করা যায়। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক, বিশেষ করে স্যালাইন, ওষুধ ও পরীক্ষার সামগ্রী জেলা ও উপজেলা হাসপাতাল পর্যন্ত পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।’

এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের জন্য বর্তমান নগর কাঠামোকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করলেন নগর বিশেষজ্ঞ, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাজধানীতে জনঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। এত জনঘনত্বপূর্ণ স্থানে মশাবাহিত রোগ খুব দ্রুত ছড়ায়। ঢাকায় বৃষ্টিপাতের সময়ে নানা কারণে জলাবদ্ধতা হয়। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ (শহরের যেসব স্থানে উষ্ণতা বেশি) এর প্রভাব থাকে, যার ফলে মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।’

এ বছর ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়বে এমন আশঙ্কা জানিয়ে এই নগর গবেষক বলেন, ‘পরিসংখ্যান আমাদের সে তথ্যই দিচ্ছে। নগর কাঠামোর কোনো পরিবর্তন না হওয়া এবং বর্তমান নগর পরিকল্পনার অব্যবস্থাপনা এসব মিলিয়ে পরিস্থিতি সেদিকেই ইঙ্গিত করছে।’


অবশেষে চালু হচ্ছে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর
২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ জুন, ২০২৬

২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল

নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর ঐতিহ্যবাহী আবু সিনা ছাত্রাবাস ভেঙে নির্মাণ করা হয় ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল। নাগরিক সমাজের আপত্তি উপেক্ষা করে তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ দায়িত্বশীলরা অনেকটা জোর করে নগরের চৌহাট্টা এলাকায় প্রায় ৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেন এই হাসপাতাল। নির্মাণকাজ ২০২৩ সালে শেষ হলেও এতোদিন এটি চালু করা যায়নি। প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলো এ হাসপাতাল। অবশেষে নগরের চৌহাট্টা এলাকার এ হাসপাতালটি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রোববার সিলেট সফরে এসে বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এই হাসপাতাল চালুর আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ‘সিলেটে শীঘ্রই ২৫০ শয্যার হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। এছাড়া সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ১২০০ শয্যার অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে।’

রবিবার (৩১ মে) বিকেলে সিলেটের মুসলিম সাহিত্য সংসদে মহানগর বিএনপি আয়োজিত প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এরআগে গত ২০ এপ্রিল সিলেট জেলা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।

তারও আগে এই হাসপাতাল নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, শত কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হলেও এটি কেন নির্মিত হয়েছে কেউ জানে না। স্বাস্থ্যসংশ্লিস্ট কোন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা না করেই এই স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। আমি সংশ্লিস্টদের সাথে আলাপ করে এটি চালুর ব্যবস্থা করবো।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গার ওপর এই জেলা হাসপাতাল নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণপূর্ত অধিদপ্তর হাসপাতালটির অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডকে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। হাসপাতাল চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, ভবন নির্মাণসহ রংকরণের কাজও সম্পন্ন হয়েছে। তবে ভবনে হাসপাতালের কোনো যন্ত্রপাতি আনা হয়নি।

জানা গেছে, হাসপাতাল ভবন নির্মাণ শেষ হলেও ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয় নাকি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তা পরিচালনা করবে, সেটি এখনও নির্ধারণ হয়নি। হাসপাতাল হস্তান্তরের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ না পাওয়ায় গণপূর্ত বিভাগ এরই মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছে।

গণপূর্ত বিভাগ জানায়, ১৫ তলা হাসপাতাল ভবনে আটতলা পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। রঙের কাজ, ইলেক্ট্রিক, টাইলস, গ্লাস, দরজা, জানালা লাগানোও সম্পন্ন। হাসপাতাল ভবনের বেসমেন্টে রয়েছে কার পার্কিং; প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার, ওয়েটিং রুম; দ্বিতীয় তলায় আউটডোর, রিপোর্ট ডেলিভারি ও কনসালট্যান্ট চেম্বার; তৃতীয় তলায় ডায়াগনস্টিক; চতুর্থ তলায় কার্ডিয়াক ও জেনারেল ওটি, আইসিসিইউ, সিসিইউ; পঞ্চম তলায় গাইনি বিভাগ, অপথালমোলজি, অর্থোপেডিক্স ও ইএনটি বিভাগ এবং ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন। এর মধ্যে আইসিইউ বেড ১৯টি, সিসিইউ বেড ৯টি এবং ৪০টি কেবিন রয়েছে। গত ২ মে সিলেট সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দ্রুততম সময়ে হাসপাতালটি চালুর আশ্বাস দিয়েছিলেন।


মশা: ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ যে ৫ টি মশাবাহিত রোগ বাংলাদেশে ছড়ায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

মশা: ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ যে ৫ টি মশাবাহিত রোগ বাংলাদেশে ছড়ায়

পৃথিবীতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশা রয়েছে, এর মধ্যে মাত্র ১০০ টির মত প্রজাতি রোগ ছড়ায়। এখনো পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে মশা থেকে ২০টির মত রোগ ছড়ায়। পুরো পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের আক্রমণে প্রতিবছর যত মানুষ মারা যান, তাদের মধ্যে মশাবাহিত রোগে মারা যান সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ। মশাবাহিত রোগ বিষয়ে সচেতনতা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিবছর ২০শে অগাস্ট পালিত হয় বিশ্ব মশা দিবস।

বাংলাদেশের মশা

কীটতত্ত্ববিদ এবং গবেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২৩ প্রজাতির মশার খোঁজ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকাতেই ১৪টি প্রজাতির মশা পাওয়া যায়।কীটতত্ত্ববিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বিবিসিকে বলেছেন, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মশাবাহিত পাঁচটি রোগের কথা জানা যায়।

এর মধ্যে রয়েছে ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং জাপানিজ এনসেফালাইটিস।

ম্যালেরিয়া

স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু ছড়ায়। বাংলাদেশে মোট ৩৬ প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা দেখা যায়, এদের মধ্যে সাতটি প্রজাতি বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়ায়।

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেছেন, এই সাত প্রজাতির মধ্যে চারটি প্রজাতি ম্যালেরিয়ার প্রধান বাহক বাংলাদেশে।

এই মূহুর্তে বাংলাদেশের ১৩টি জেলার ৭২টি থানায় ম্যালেরিয়া রোগের উপস্থিতি রয়েছে। মূলত পার্বত্য ও সীমান্ত এলাকাতেই ম্যালেরিয়া বেশি দেখা যায়। এটি গ্রীষ্মকালে হয়।

২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, মারা যান ১৫৪ জন। পরে এ সংখ্যা কমে আসে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আফসানা আলমগীর খান‌ বিবিসিকে বলেছেন, এখন ম্যালেরিয়া প্রকোপের ৯০ শতাংশের বেশি হয় দেশে তিন পার্বত্য জেলায়। তিনি জানিয়েছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের পরিকল্পনা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কাজ করছে।

ফাইলেরিয়া

কিউলেক্স মশার দুটি প্রজাতি এবং ম্যানসোনিয়া মশার একটি প্রজাতির মাধ্যমে বাংলাদেশে ফাইলেরিয়া রোগ ছডায়।

ফাইলেরিয়া রোগে মানুষের হাত-পা ও অন্যান্য অঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে। একে স্থানীয়ভাবে গোদ রোগও বলা হয়।

বাংলাদেশের ৩৪টি জেলায় ফাইলেরিয়া আক্রান্ত রোগী দেখা যায়।

ডেঙ্গু

এডিস মশার দুইটি প্রজাতি- এডিস ইজিপ্টি এবং অ্যালবোপিকটাস, মূলত ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু ছড়ায়।

এডিস মশা পাত্রে জমা পরিষ্কার পানিতে জন্মায়। সাধারণত বর্ষাকালে এর ঘনত্ব বেশি হয়, ফলে ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাবও এ সময়ে বেড়ে যায়।

কিন্তু বাংলাদেশে চলতি বছর করোনাভাইরাস মহামারির পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ অনেকগুন বেড়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি থেকে ১৭ই অগাস্ট পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৬,৬৫০ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সেই সঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়ে থাকে।

তীব্র পেটে ব্যথাও হতে পারে। শরীরে বিশেষ করে মাংসপেশীতে তীব্র ব্যথা হয়। জ্বরের ৪/৫ দিন পার হলে শরীরজুড়ে র‌্যাশ বা ঘামাচির মত লালচে দানা দেখা দেয়।

সাথে বমি ভাব, এমনকি বমিও হতে পারে।

ডেঙ্গু গুরুতর হলে রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়, চোখের কোনা, দাঁতের মাড়ি বা নাক থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

ডা. আফসানা আলমগীর খান‌ বলেছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর প্রধাণ কারণ হচ্ছে আক্রান্ত হবার পর পরিস্থিতি খারাপ না হওয়া পর্যন্ত লোকে ডাক্তারের কাছে যায় না।

তিনি বলেন, লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা মাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সথে রক্তে প্লাটিলেটের পরিমাণ খেয়াল রাখতে হবে।

চিকুনগুনিয়া

চিকুনগুনিয়া রোগও এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে প্রথম চিকুনগুনিয়া ধরা পড়ে।

চিকুনগুনিয়া জ্বরের লক্ষণ সাধারণ ভাইরাল ফিভারের মত।

তবে মাথাব্যথা, বমি ভাব, দুর্বলতা, সর্দি-কাশি, এবং র‌্যাশের সঙ্গে শরীরে হাড়ের জয়েন্ট বা সংযোগস্থলে তীব্র ব্যথা হয়।

চিকুনগুনিয়া হলে অধিকাংশ সময় তিন থেকে চার দিনের মধ্যে জ্বর সেরে যায়। কিন্তু হাড়ের সংযোগস্থলগুলোতে হওয়া ব্যথা কারো কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ভোগায়।

জাপানিজ এনসেফালাইটিস

অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, জাপানিজ এনসেফালাইটিস রোগটি কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়।

১৯৭৭ সালে মধুপুর বন এলাকায় প্রথম জাপানিজ এনসেফালাইটিস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন।

এরপর বিভিন্ন সময়ে রাজশাহী, রংপুর, চট্টগ্রাম এবং খুলনা অঞ্চলে এই রোগটি পাওয়া যায়।

অধ্যাপক বাশার বলছেন, বাংলাদেশে মশাবাহিত এই পাঁচ ধরণের রোগই মূলত দেখা যায়।

তবে কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে জিকা ভাইরাস আক্রান্ত দুইজন রোগী শনাক্ত হয়েছিলেন।

এরপর গত কয়েক বছরে আর জিকা ভাইরাস আক্রান্ত কাউকে শনাক্তের কথা শোনা যায়নি।

ফলে বাংলাদেশে এর অস্তিত্ব আছে বলে তিনি মনে করেন না।

কীভাবে মশাবাহিত রোগ থেকে সুস্থ থাকবেন

মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হবার আগেই সতর্ক হবার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ আক্রান্ত হবার পর সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন না হলে মৃত্যুসহ নানা ধরণের জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ডা. আফসানা আলমগীর খান এবং অধ্যাপক কবিরুল বাশারের পরামর্শ অনুযায়ী মশাবাহিত রোগ থেকে সুস্থ থাকার কয়েকটি উপায় বলছেন, যা এরকম

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার এই দুইটি রোগের জন্যই দায়ী এডিস মশা সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার আগে এডিস কামড়ায়। ফলে এই দুই সময়ে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ রাখতে হবে

ঘুমানোর সময় মশারি খাটিয়ে ঘুমাতে হবে

বাড়ির ছাদে বা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনে, বাতিল টায়ার কিংবা প্লাস্টিক কন্টেইনার- কোথাও যাতে তিন থেকে পাঁচদিনের বেশি পানি জমা না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে

মশার কামড় থেকে বাঁচতে নানা ধরণের রিপেলেন্ট অর্থাৎ মশা তাড়ানোর পণ্য যেমন বিভিন্ন ধরণের কয়েল, স্প্রে, ক্রিম জাতীয় পণ্য ব্যবহার করা, তবে এর মাত্রা ও প্রয়োগ সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে।

এগুলো সবই মশাবাহিত কোন রোগে আক্রান্ত হবার আগের সতর্কতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিতে হবে।

মশা তাড়ানোর প্রাকৃতিক পদ্ধতি

বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন মশা তাড়াতে কয়েল বা স্প্রে ব্যবহার না করে প্রাকৃতিক উপায় চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

তবে ঢাকায় মশার সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে তাতে এসব কায়দা কতটা খাটবে সে আশংকাও রয়েছে।

অনেক বছর ধরে মশা তাড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে এমন কয়েকটি প্রাকৃতিক পদ্ধতি নিচে বর্ণনা করা হলো:

নিমে মশা তাড়ানোর বিশেষ গুণ রয়েছে। প্রাচীনকালে মশা তাড়াতে নিমের তেল ব্যবহার করা হত। ত্বকে নিম তেল লাগিয়ে নিলে মশা ধারে-কাছেও ভিড়বে না বলে প্রচলিত।

বলা হয়ে থাকে মশা কর্পূরের গন্ধ সহ্য করতে পারে না। ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে কর্পূর দিয়ে রাখলে মশা পালিয়ে যায়।

লেবু আর লবঙ্গ একসঙ্গে রেখে দিলে ঘরে মশা থাকে না বলে প্রচলিত আছে। এগুলো জানালায় রাখলে মশা ঘরে ঢুকতে পারবে না

ব্যবহৃত চা পাতা ফেলে না দিয়ে রোদে শুকিয়ে সেটা জ্বালালে চা পাতার ধোঁয়ায় ঘরের সব মশা-মাছি পালিয়ে যাবে। কিন্তু এতে শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হবে না।

মশা নিয়ে কয়েকটি মজার তথ্য

  • একটি মশা সেকেন্ডে প্রায় ৩০০-৬০০ বার ডানা ঝাপটায়, মশা ওড়ার সময় এই ডানা ঝাপটানোর শব্দই শুনি আমরা
  • কেবলমাত্র স্ত্রী মশাই মানুষকে কামড়ায়, পুরুষ মশা নয়।
  • মশা ঘণ্টায় প্রায় দেড় মাইল বেগে উড়তে পারে
  • ডিম ফুটে বের হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই মশা মানুষকে কামড়ে রক্ত শুষে নেয়
  • মশা স্তন্যপায়ী প্রাণীকে কামড়ানোর পাশাপাশি পাখি ও সরীসৃপের শরীরেও হুল ফোটায়
  • মশা তার নিজের ওজনের তিনগুণ রক্ত শুষে নিতে পারে

পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৭ জুন, ২০২৩

পাকস্থলী-পিত্তথলির ক্যান্সার বেশি তরুণী ও মধ্যবয়সী নারীদের

দেশের মানুষের মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ ক্যান্সার। বছরে এক লাখেরও বেশি মানুষ এ রোগে মারা যায়। দেহের স্থানভেদে কর্কট রোগ হয় বিভিন্ন প্রকার। আবার এক ক্যান্সারেরই রয়েছে অনেক ধরন। এর মধ্যে তরুণী এবং মধ্যবয়সী নারী ও পুরুষের মাঝে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। বিশেষ করে এ বয়সী নারীর মধ্যে এর আক্রান্ত ও মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচারের পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি এ রোগ বাড়াচ্ছে বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি) গত মার্চে ‘হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস অ্যান্ড রিলেটেড ডিজিজেস রিপোর্ট’ শিরোনামে এক গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। তাতে বাংলাদেশের সব বয়সী নারী-পুরুষের ৩৩টি ক্যান্সারের বিভাজন দেখিয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ১৫-৪৪ বছর বয়সী নারীর মধ্যে পাকস্থলী ও পিত্তথলির ক্যান্সারে আক্রান্তের হার বেশি। এ রোগে তাদের মৃত্যুও বেশি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। 

আইএআরসি বলছে, ১৫-৪৪ বছর বয়সী প্রতি এক লাখ নারীর মধ্যে ২ দশমিক ৬৭ জন পিত্তথলির ক্যান্সারে ভোগে, যেখানে পুরুষের আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক ৪৭। একইভাবে প্রতি লাখে মৃত্যু হচ্ছে ২ দশমিক শূন্য ৮ নারীর ও শূন্য দশমিক ৩৭ পুরুষের। পাকস্থলীর ক্যান্সারেও এ বয়সী নারীর আক্রান্তের হার পুরুষের চেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১ দশমিক ৩৭ পুরুষ এ রোগে ভুগলেও নারী আক্রান্ত হচ্ছে ১ দশমিক ৫৭ জন। একইভাবে প্রতি লাখে শূন্য দশমিক ৮৩ জন পুরুষের বিপরীতে মৃত্যু হচ্ছে ১ দশমিক ১৩ নারীর। 

যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) বলছে, পাকস্থলীর যেকোনো অংশে ক্যান্সার পাওয়া যেতে পারে। তবে এটি কতটা গুরুতর তা নির্ভর করে রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে কিনা তার ওপর। পিত্তথলির ক্যান্সারও খাদ্যের পরিপাকে বিশেষ ভূমিকা রাখা এ অঙ্গের যেকোনো অংশে পাওয়া যেতে পারে। 

জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) ক্যান্সার রোগতত্ত্বের সাবেক অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাকস্থলীর ক্যান্সার হওয়ার পেছনে বেশকিছু কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, খাওয়াদাওয়ার ব্যাপার আছে। খুব স্পাইসি খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। অ্যাসিডিটির সঙ্গে সম্পর্ক আছে। হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি বা এইচ পাইলোরি ব্যাকটেরিয়ায় সৃষ্ট সংক্রমণের কারণে পাকস্থলীর ক্যান্সার হতে পারে। তারপর অ্যালকোহলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে। অনেক সময় গলব্লাডারে স্টোন (পিত্তথলিতে পাথর) হয়, সেটা থেকেও সংক্রমণ হয়। নারীদের ক্যান্সারের সঙ্গে জীবনাচার ও খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে।’

সব বয়সী নারী ও পুরুষের মধ্যে ক্যান্সার বিভাজনের ক্ষেত্রে আইএআরসি বলেছে, নারীর মধ্যে স্তন ক্যান্সার সবচেয়ে বেশি। প্রতি লাখে ১৬ জন এ ক্যান্সারে আক্রান্ত। এর পরে রয়েছে জরায়ুমুখের ক্যান্সার। এতে প্রতি লাখে আক্রান্তের সংখ্যা ১০ জনেরও বেশি। খাদ্যনালীর ক্যান্সারে ৯ দশমিক ৩৪, পিত্তথলির ক্যান্সারে ৬ দশমিক ৫৫ এবং ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে প্রতি লাখে ৫ দশমিক ৬৮ জন আক্রান্ত হচ্ছে। অন্যদিকে পুরুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্যান্সার হচ্ছে খাদ্যনালীর, প্রতি লাখে ১৭ জন। এরপর ফুসফুসের ক্যান্সার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এতে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ দশমিক ৮ জন। তৃতীয় অবস্থানে ঠোঁট ও মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে ১১ জন পুরুষ। 

বাসি খাবার গ্রহণ পাকস্থলী ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ কারণ জানিয়ে এনআইসিআরএইচের ক্যান্সার ডায়াগনস্টিকের সাবেক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘শুঁটকি ও অতিরিক্ত লবণ পাকস্থলীর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। পিত্তথলিতে পাথর হলে সেখান থেকে ক্যান্সার হয়। এছাড়া খাদ্যে ভেজালেও এ ক্যান্সারগুলো হতে পারে। ঝাল, লবণ ও সংক্রমণের কারণে এসব ক্যান্সার প্রভাবিত হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদের ক্ষেত্রে গলব্লাডারে ক্যান্সার বেশি হয়।’

বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে কোনো ক্যান্সার রেজিস্ট্রি নেই। বছরে সারা দেশে কত রোগী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে বা মারা গেছে এমন হিসাব সরকারের কাছে নেই। তবে গ্লোবাল ক্যান্সার ইনসিডেন্স, মর্টালিটি অ্যান্ড প্রিভিলেন্স (গ্লোবোক্যান) পরিসংখ্যানের আলোকে আইএআরসি একটি হিসাব করেছে। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশে গত পাঁচ বছরে শনাক্তকৃত রোগীর মধ্যে এখনো ক্যান্সারে আক্রান্ত রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যে ২০২০ সালে শনাক্ত হয়েছিল ১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৭৫ জন। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ক্যান্সার রোগীর।

বিশেষজ্ঞরা যদিও বলছেন, দেশে বছরে তিন-চার লাখের মতো মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। মারা যাচ্ছে দেড় লাখ। কোথাও এ হিসাব তালিকাভুক্ত হচ্ছে না। প্রাক্কলিত রোগীর সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ ক্যান্সার রোগী বছরে রোগ শনাক্তের বাইরে থেকে যায়। দেশে বিশেষায়িত পর্যায়ের (টারশিয়ারি) সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসার কমবেশি সুবিধা রয়েছে। তবে সরকারিভাবে একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল এনআইসিআরএইচ। সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার রোগীরাই চিকিৎসার জন্য দেশের সর্বোচ্চ এ হাসপাতালে আসে। তাদের তথ্যে তৈরি রেজিস্ট্রি দেশের ক্যান্সার রোগীর হিসাবের প্রতিনিধিত্ব করে। 

হাসপাতালটির ক্যান্সার রোগতত্ত্ব (ক্যান্সার এপিডেমিওলজি) বিভাগ সম্প্রতি ‘ক্যান্সার রেজিস্ট্রি রিপোর্ট: ২০১৮-২০’ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৮৩ হাজারের কিছু বেশি রোগী চিকিৎসার জন্য বহির্বিভাগে এসেছিল। এর মধ্যে সাড়ে ৩৫ হাজারের ক্যান্সার শনাক্ত হয়েছে। দেশে সাধারণভাবে পুরুষের চেয়ে নারী ক্যান্সার রোগীদের হার বেশি। এ তিন বছরেও হাসপাতালটিতে ক্যান্সার শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে নারীর হার ছিল ৫৫ শতাংশ।

শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা ক্যান্সারের জেনেটিক (বংশগতি) প্রবণতা থাকে, সেই প্রবণতা জাতিতে জাতিতে বিভিন্ন রকম হয়। জেনেটিক কারণে বিভিন্ন জাতি এবং এমনকি এক জাতির বিভিন্ন ব্যক্তি বা বংশের মধ্যেও অনেক সময় জেন্ডারের প্রবণতা ভিন্ন হয়। এখন জেন্ডারের প্রবণতা থেকে জিনের যে প্রবণতা অনেক যুগ থেকে, অনেক জেনারেশন থেকেই হয় তো ছিল। রোগটা বীজের মতো। জিনটা বীজের মতো। বীজকে যেমন মাটি-পানি না দিলে সেটি গাছে পরিণত হবে না, তেমনি ক্যান্সারও পরিবেশের কারণে প্রভাবিত হয়। কোনো একটি জেনেটিক কারণ থাকে, তার সঙ্গে প্রবণতাটা বাড়ে। পরিবেশে কৃত্রিম খাবার, রঙ অর্থাৎ জীবনে কৃত্রিমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম উপাদানও বেড়েছে। এটাও ক্যান্সারের জীবাণুকে প্রভাবিত করে। এর প্রবণতাও বেড়ে গেছে।’

মানুষের ওজন আধিক্যের সঙ্গে ক্যান্সারের সুস্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে জানিয়ে ডা. লিয়াকত আলী আরো বলেন, ‘আমাদের জীবনাচার, কায়িক শ্রম কমে যাওয়ার কারণে ওজন আধিক্য সৃষ্টি হচ্ছে। জীবনাচারের পরিবর্তন ও দূষণের সঙ্গে যে কৃত্রিম উপাদানগুলো বেড়ে গেছে তাতে বহুগুণেই ক্যান্সারসহ দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগ বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা পুরুষের মধ্যে বেশি আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর মধ্যে বেশি।’ 

জাতীয়ভাবে ক্যান্সারের কোনো রেজিস্ট্রি না থাকায় সারা দেশের চিত্র মূলত কেমন তা বলা যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. রোবেদ আমিন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা গত বছর শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও হাসপাতাল, আহসানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতাল এবং একটি বেসরকারি হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য দিয়ে ক্যান্সার রেজিস্ট্রি তৈরির একটি পাইলট প্রজেক্ট করার চেষ্টা চালিয়েছি। সেখানে বিভিন্ন ক্যান্সার রোগী পেয়েছি। তবে তা কোনোটাই জাতীয় অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না। আইএআরসি যে তথ্য দিয়েছে তা প্রাক্কলিত। এটা দিয়েও জাতীয় অবস্থা বোঝা যাবে না। জাতীয় ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তাও তাদের রোগীদের। সমগ্র বাংলাদেশের তথ্য সেখানে নেই। আমরা পরিকল্পনা করেছি, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বড় পাঁচটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে আমরা রোগীদের তথ্য নিয়ে কাজ করব। এতে কিছুটা ভালো তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া ক্যান্সারসহ সব অসংক্রামক রোগকে গুরুত্ব দিয়ে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’