সুনির্মল সেন: রামিসার জন্য আজ আর শোক নয়! রামিসা হত্যার দৃশ্যমান বিচার চাই! কঠিন থেকে কঠিনতর বিচার চাই। আর কতো শিশুর রক্ত ঝরলে এ দেশের টনক নড়বে? রামিসার বয়স কতোই বা ছিলো? এমন একটি বয়স, যখন শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা, পেন্সিল আর স্কুলব্যাগ। এমন একটি বয়স, যখন পৃথিবীকে চেনার কথা মায়ের হাত ধরে, স্কুলের পথে, বন্ধুর হাসিতে, ছোট ছোট স্বপ্নে। অথচ সেই শিশুটিই আজ আমাদের সামনে রেখে গেছে এক ভয়াবহ প্রশ্ন! এই দেশে শিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা কোথায়?
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার পল্লবীতে সংঘটিত শিশু রামিসা হত্যাকান্ড নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তবে আমাদের প্রশ্ন, এ নির্মম নৃশংস হত্যার শিকার শিশু রামিসা আক্তারের বাবার বুকফাটা আর্তনাদ ও ক্ষোভের যে বিবরণ গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা কি সমাজের বিবেককে নাড়া দেবে? একটি সাত বছরের শিশুকে যে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে, তা আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার দূর্বল দিকটি উন্মোচিত করেছে।
এই নির্মম হত্যাকান্ড আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশে সামাজিক মূল্যবোধের কতোটা অধঃপতন ঘটেছে। একই সাথে শিশু রামিসার বাবার ক্ষোভ অপরাধীদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি না হওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ। বস্তুত এ দায়মুক্তির সংস্কৃতি নতুন নতুন অপরাধের জন্ম দিচ্ছে।
আমাদের সমাজে শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা দিনের পর দিন উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পারিবারিক শত্রুতা, জমিজমা নিয়ে বিরোধ কিংবা তুচ্ছ কোনো ঘটনার প্রতিশোধ নিতে এখন কোমলমতি শিশুদের টার্গেট করা হচ্ছে, যা চরম বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। বস্তুত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, এগুলো বহু বছর ধরে চলে আসা নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক দায়িত্বহীনতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয়ের প্রতিফলন। মাদকের বিস্তারও এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
রাজধানী পল্লবীর এ হত্যাকান্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গঠনে আমরা কতোটা ব্যর্থ হয়েছি। রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে এর কারণ যথাযথভাবে খুঁজে বের করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে।সাম্প্রতিক রামিসা হত্যাকান্ড সহ ইতোপূর্বের সকল হত্যাকান্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে অপরাধীর দ্রুত সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তবে এ ধরণের অপরাধ রোধে শুধু আইন বা সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, এর জন্য শক্তিশালী সামাজিক আন্দালন গড়ে তোলা এখন জরুরী হয়ে পড়েছে। যে সব কারণে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে, সেসব বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া জরুরি। আর কোনো মা -বাবা ও বোনের বুক যেনো এভাবে খালি না হয়, আর কোনো পরিবারকে যেনো এমন নির্মম, নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজকে। সর্বশেষে বলতে হয়, "আর কতো রামিসা মরলে আমাদের সবার টনক নড়বে?" (লেখক: কবি ও গণমাধ্যমকর্মী)